আমরা এমন এক সমাজে বাস করি যেখানে মানুষের সফলতাকে হাততালি দিয়ে স্বাগত জানানো হয়, কিন্তু ব্যর্থতাকে দেখা হয় অপরাধ হিসেবে। কিন্তু আপনি কি জানেন, পৃথিবীর সবচেয়ে সফল মানুষগুলোর শুরুটা হয়েছিল চরম ব্যর্থতা দিয়ে?
১. ‘ব্যর্থতা’ যখন শ্রেষ্ঠত্বের প্রথম ধাপ
মাইক্রোসফটের প্রতিষ্ঠাতা বিল গেটস-এর কথা ভাবুন। আমরা সবাই তাকে বিশ্বের অন্যতম ধনী ব্যক্তি হিসেবে চিনি। কিন্তু মাইক্রোসফট তৈরির আগে তিনি 'Traf-O-Data' নামে একটি ব্যবসা শুরু করেছিলেন, যা পুরোপুরি মুখ থুবড়ে পড়েছিল। সেই ব্যবসায় তিনি এবং তার পার্টনার ব্যাপক লোকসান করেন।
বিল গেটস চাইলে সেদিনই থেমে যেতে পারতেন। কিন্তু তিনি বিশ্বাস করতেন— "সাফল্য উদযাপন করা ভালো, তবে তার চেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ হলো ব্যর্থতা থেকে শিক্ষা নেওয়া।" তিনি তার ব্যর্থতাকে ভয় না পেয়ে সেটাকে অভিজ্ঞতায় রূপান্তর করেছিলেন বলেই আজ সারা পৃথিবী তার প্রযুক্তিতে চলে।
২. সমালোচনার ‘গোলমাল’ এড়িয়ে চলা
মানুষ যখন নতুন কিছু করতে যায়, চারপাশের মানুষ তখন নানা কথা বলে। লোকে বলে, "এটা সম্ভব না", "ওকে দিয়ে হবে না"। আধুনিক প্রযুক্তির জাদুকর স্টিভ জবস-এর উদাহরণ দেখুন। তাকে তার নিজের তৈরি করা কোম্পানি 'অ্যাপল' থেকেই বের করে দেওয়া হয়েছিল। ভাবুন তো, যে কোম্পানি আপনি বানালেন, সেখান থেকেই আপনাকে তাড়িয়ে দেওয়া হলো—এর চেয়ে বড় অপমান আর কী হতে পারে?
তখন চারদিকে অনেক সমালোচনা হয়েছিল। কিন্তু স্টিভ জবস মানুষের কথায় কান দেননি। তিনি দমে না গিয়ে নতুন নতুন প্রজেক্ট শুরু করেন এবং এক সময় আরও শক্তিশালী হয়ে অ্যাপল-এ ফিরে আসেন। তিনি প্রমাণ করেছেন যে, মানুষের নেতিবাচক মন্তব্য আপনার গন্তব্য ঠিক করতে পারে না, যদি আপনার নিজের ওপর বিশ্বাস থাকে।
৩. জীবন যখন একটা লড়াইয়ের ময়দান
জীবনটা অনেকটা ম্যারাথন দৌড়ের মতো। মাঝপথে কেউ ধাক্কা দেবে, কেউ আপনাকে ছাড়িয়ে চলে যাবে। কেউ হয়তো গ্যালারি থেকে আপনার দিকে বিদ্রূপ মন্তব্য ছুড়ে দেবে। কিন্তু আপনি যদি গ্যালারির দিকে তাকিয়ে দৌড় থামিয়ে দেন, তবে আপনি কোনোদিনই ফিনিশিং লাইনে পৌঁছাতে পারবেন না।
আপনার কাজ হলো কান বন্ধ করে শুধু সামনের দিকে তাকানো। গোল মিস হতে পারে, কিন্তু গোল দেওয়ার আপ্রাণ চেষ্টা করাই হলো আসল ব্যক্তিত্ব। এই নিরন্তর চেষ্টাই একদিন আপনাকে সাধারণ থেকে অসাধারণ করে তুলবে।
যদি বর্তমানে আপনি কোনো ব্যর্থতা বা মানসিক চাপের মধ্য দিয়ে যান, তবে এই কাজগুলো করুন:
ভুল থেকে নোট নিন: ব্যর্থতাকে লুকাবেন না। কেন ভুল হলো তা খুঁজে বের করুন এবং পরবর্তী কাজে সেই অভিজ্ঞতা কাজে লাগান।
লোকের জাজমেন্ট এড়িয়ে চলুন: লোকে কী ভাববে তা ভাবার দায়িত্ব লোকের ওপর ছেড়ে দিন। আপনি আপনার ফোকাস ঠিক রাখুন।
ক্ষুদ্র জয়কে বড় করে দেখুন: আজকের ছোট একটি ভালো কাজই আগামীকালের বড় সাফল্যের ভিত্তি।
নিজেকে সময় দিন: আপনি রোবট নন যে সব কিছু একবারেই নিখুঁত হবে। নিজেকে নতুন করে গুছিয়ে নেওয়ার সুযোগ দিন।
আপনারা জানলে অবাক হবেন
টমাস আলভা এডিসন যিনি কিনা বৈদ্যুতিক বাল্বের জনক। কিন্তু খুব কম মানুষই জানে, এই আবিষ্কারের পেছনে লুকিয়ে আছে হাজারো ব্যর্থতা, নিরাশা আর অদম্য পরিশ্রমের গল্প।
এডিসনের স্বপ্ন ছিল এমন একটি বাতি তৈরি করা, যা দীর্ঘ সময় ধরে জ্বলবে এবং সবার ঘরে আলো ছড়াবে। কিন্তু কাজটা মোটেও সহজ ছিল না। তিনি একটার পর একটা পরীক্ষা করতেন, আর প্রতিবারই ব্যর্থ হতেন। কখনো ফিলামেন্ট পুড়ে যেত, কখনো আলো জ্বলতই না।
অনেকে তাকে বলত,
“তুমি এতবার ব্যর্থ হয়েও কেন চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছ?”
একদিন একজন সাংবাদিক তাকে প্রশ্ন করল,
“আপনি তো হাজার বার ব্যর্থ হয়েছেন, এতে কি আপনি হতাশ নন?”
এডিসন মুচকি হেসে উত্তর দিলেন,
“আমি ব্যর্থ হইনি। আমি শুধু হাজারটা উপায় শিখেছি যেগুলো কাজ করে না।”
প্রায় এক হাজারেরও বেশি বার পরীক্ষা করার পর তিনি অবশেষে এমন একটি ফিলামেন্ট খুঁজে পেলেন, যা দীর্ঘ সময় ধরে জ্বলতে পারে। সেই দিনই পৃথিবী পেল বৈদ্যুতিক বাল্বের আলো।
এডিসনের সাফল্যের রহস্য ছিল তার মনোভাব। তিনি ব্যর্থতাকে পরাজয় ভাবেননি, বরং শিক্ষা হিসেবে নিয়েছিলেন। প্রতিটি ভুল তাকে পরবর্তী সঠিক পথে নিয়ে গেছে।
তিনি বলতেন,
“Genius is one percent inspiration and ninety-nine percent perspiration.”
অর্থাৎ প্রতিভা কম, পরিশ্রমই বেশি দরকার।
আজ যদি এডিসন একবার হাল ছেড়ে দিতেন, তাহলে হয়তো আমরা আজও অন্ধকারেই থাকতাম।
সাহসী হোন: রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের সেই কথাটি মনে রাখুন— "মহত্ত্বকে পদে পদে নিন্দার কাঁটা মাড়াইয়া চলিতে হয়।" সমালোচনা মানেই হলো আপনি গুরুত্বপূর্ণ কিছু করার চেষ্টা করছেন।
উপসংহার:
স্বপ্ন সেটা নয় যা মানুষ ঘুমিয়ে দেখে, স্বপ্ন সেটা যা মানুষকে ঘুমাতে দেয় না। আপনার স্বপ্ন যদি লোকের কাছে ‘পাগলামি’ মনে না হয়, তবে বুঝে নেবেন আপনার স্বপ্নটা এখনো বড় হয়নি।
পাছে লোকে কিছু বলবে—এই ভয়কে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে নিজের পথে অটল থাকুন। মনে রাখবেন, নদীর স্রোত যেমন পাথরকে ক্ষয় করে তার পথ তৈরি করে নেয়, আপনার ধৈর্য ও পরিশ্রমও একদিন সব সমালোচনার দেয়াল ভেঙে সাফল্যের নতুন দিগন্ত উন্মোচন করবে।
"আপনার আজকের এই কঠিন সময়টিই আগামী দিনেগল্পের সবচেয়ে চমৎকার অধ্যায় হবে।"